Home Uncategorized বাংলার মহিলা চিত্রশিল্পীদের কথা

বাংলার মহিলা চিত্রশিল্পীদের কথা

by admin

কথায় বলে কালি কলম মন লেখে তিনজন৷ শুধু কি আর লেখা ছবির ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য৷  শুধু লেখা নয়,  ছবি আঁকার ক্ষেত্রেও এই কথাটি প্রযোজ্য৷  কুমোর কলসি গড়ে,  তার গায়ে ফুল-পাতা এঁকে দেয়, আবার কাঠ কেটে নক্সা গড়ে ছুতোর নকশা  শিল্প মাধুর্য ফুটিয়ে তোলে৷  কিন্তু অন্তঃপুরবাসিনীরা সু্ন্দরের আরাধনা করেন নকসিকাঁথা বুনে, সন্দেশে ছাঁচ তুলে, গয়নাবড়ি বানিয়ে কিংবা শীতের দিনে প্রিয়জনকে গরম জামায় মুড়ে৷ ইংরেজদের হাত ধরে ব্রিটিশ ভারত বেশ কিছু চিত্রপ্রদর্শনী দেখেছে৷ তারই ফলে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু নারী  যাঁরা নিজেদের ভাবনা প্রসারিত করতে পেরেছিলেন তাদের তুলির ছোঁয়ায়৷ জেনে অবাক হবেন,  ১৮৭৯ সালের কলকাতা প্রথম দেখেছিল ২৫ জন মহিলাশিল্পীদের আঁকা নিয়ে একটি চিত্রপ্রদর্শনী। এর প্রায় ৫০ বছর পর ক্যালকাটা গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুল ছাত্রীদের জন্য।

হারান চন্দ্র মিত্রের কন্যা গিরীন্দ্রমোহিনী দাসীর (১৮৫৮ – ১৯২৪)চিত্রচর্চা পছন্দ লর্ড মিন্টোর পত্নীর খুব পছন্দ হয়৷   তাঁরই উদ্যোগে গিরীন্দ্রমোহিনী দাসীর  ছবি স্থান পায় সুদূর অস্ট্রেলিয়ার  চিত্রপ্রদর্শনীতে। সেকালের ‘ভারতী’, ‘মানসী’ ও ‘মর্মবাণী’ পত্রিকায় তাঁর ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর  ও অবনীন্দ্রনাথ  ঠাকুরের বোন সুনয়নী দেবী (১৮৭৪ – ১৯৫৭)  দাদাদের মতোই চিত্রকলায় পারদর্শী ছিলেন।

তাঁর তুলিতে বাংলার আটপৌরে নারী ও তাদের ঘরকন্নার ছবি ফুটে ওঠে৷ নানা দেবদেবীর ছবিও তিনি আঁকেন৷ খানিকটা পটচিত্রের আঙ্গিকে আঁকা তাঁর ছবিতে রয়েছে সহজ স্বতঃস্ফূর্ততা। ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট,  ইউরোপে তাঁর বেশ কিছু প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। নজরুল ইসলাম এতটাই মুগ্ধ হন যে তার অনুপ্রেরণায় ‘খেয়াপারের তরণী’ নামে একটি কবিতা লেখেন। তৎকালীন বিখ্যাত পত্রিকা ‘মোসলেম ভারত’-এ তাঁর ছবি ছাপা হত। এছাড়া  ‘প্রবাসী’, ‘মডার্ণ রিভিউ’, ‘সুপ্রভাত’, ‘সন্দেশ’ ইত্যাদি পত্রিকায় পাঠক প্রায়ই তাঁর ছবি দেখতে পেতেন। মূলতঃ পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত থেকে তিনি ছবির রসদ সংগ্রহ করতেন।

 

Pratima Devi (painter) - Wikipedia

বাংলা আকাদেমী প্রণীত ‘চরিতাভিধানে’ হাসিনা খানমকে (১৮৯২ -?) প্রথম মুসলিম মহিলাশিল্পী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গগনেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথের ভাগ্নী প্রতিমা দেবীর (১৮৯৩ – ১৯৬৯)শিল্পপ্রেম বোধহয় রক্তেই ছিল।

 

 

রবীন্দ্রনাথের বিচিত্রা কাব্যগ্রন্থে  নন্দলাল বসুর কাছে প্রতিমা দেবীর চিত্র শিক্ষালাভ তাঁর ছবিকে আরো পরিপূর্ণতা দান করে। ফ্রেস্কো, সেরাSunayani Devi – forgotten first modern woman artist of Bengal School of Artমিক্স, বাটিক শিল্পে দক্ষতা ছিল তাঁর৷ ১৯৩৫-এ লণ্ডনে একজন মহিলা চিত্রশিল্পীর  ছবির প্রদর্শনী সে যুগে এক বাঙালী নারীর জীবনে এ এক অসামান্য কৃতিত্ব।

বিখ্যাত সাময়িকপত্র ‘প্রবাসী’, ‘মডার্ণ রিভিউ’ ইত্যাদির সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা শান্তাদেবীও (১৮৯৩ – ১৯৮৪) শৈশব থেকেই শৈল্পিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেন। রংতুলির পাশাপাশি কাঁথাশিল্পেও তিনি ছিলেন সিদ্ধা। শিল্পী শচীশচন্দ্রের স্ত্রী ইন্দুরানী সিন্হার (১৯০৫ – ?) চিত্রচর্চা শুরু বিয়ের পর৷  তেলরং, জলরং, প্যাস্টেল — সবেতেই দক্ষ ছিলেন৷ নিসর্গ চিত্রের পাশাপাশি ন্যুড স্টাডিও করেছিলেন তারা৷ ১৯৪১-এ মহিলাদের জন্য একটি আর্ট স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন। নন্দলাল কন্যা গৌরী ভঞ্জ (১৯০৭ – ?)  শান্তিনিকেতনে চিত্রশিক্ষা শুরু করেন৷  সুকুমারী দেবী অসুস্থ হলে গৌরীদেবীই কারুশিল্পের শিক্ষাভার গ্রহণ করেন। তাঁরই জন্য  বাটিক শিল্প শান্তিনিকেতনে প্রসারিত হয়।

 

গান্ধিভক্ত তাই নেতাজি নিজের বইয়ের ভূমিকা লিখতে দিতে চান নি রবীন্দ্রনাথকে

বীরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর স্ত্রী ইন্দিরা দেবী (১৯১০ – ১৯৫০) বিয়ের পর ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদারের কাছে শুরু করেন চিত্রচর্চা। আকাদেমী অফ ফাইন আর্টসের একাদশতম বার্ষিক প্রদর্শনীতে মহিলা বিভাগে তিনি শ্রেষ্ঠ হয়েছিলেন৷ অবনীন্দ্রনাথ স্নেহধন্যা এক বিখ্যাত শিল্পী হাসিরাশি দেবী।  কন্যার মৃত্যুশোক বারবার তাঁর ছবিতে ঘুরে ফিরে এসেছে। পাশাপাশি তিনি ব্যঙ্গচিত্র আঁকতেন। ‘ভারতবর্ষ’, ‘মাসিক বসুমতী’, ‘বিচিত্রা’ ইত্যাদি পত্রিকায় তাঁর ছবি প্রকাশিত হয়েছিল

 

অবনীন্দ্রনাথ স্নেহধন্যা রানী চন্দ (১৯১২ – ?) কলাভবনে আসেন ১৯২৮-এ। সেইসময় নন্দলাল ও অবনীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষালাভ করেন৷ জলরং, টেম্পেরা, ক্রেয়ন, চক, উডকাট, লিনোকাট ইত্যাদি মাধ্যমে তিনি শিল্পচর্চা করতেন। প্রাক-স্বাধীনতা যুগে মহিলা শিল্পীরা এভাবেই  ঘরকন্নার পাশাপাশি নিজেদের রঙে চারপাশ রাঙিয়ে ত্যলেছেন৷  তাঁদেরই পথ বেয়ে আজ , ইলিনা বণিক, শাকিলাদের অবাধ যাতায়াত রঙপথে৷

Related Videos

Leave a Comment