Home Entertainment উন্মুক্ত প্রান্তরের বিবর্ণ ঘোড়ারা

উন্মুক্ত প্রান্তরের বিবর্ণ ঘোড়ারা

by admin

সত্তরের দশক। এক ব্যান্ড নাকতলার একটি মঞ্চে উঠতে যাচ্ছে, আয়োজক প্রশ্ন করলেন দলের নাম কি? আমতা আমতা করছেন সবাই। একজন মিনমিন করে বললেন ‘ সপ্তর্ষি’। সেদিনের মত শো হল। কদিন পরে সেই নাম পাল্টে এলো ‘তীরন্দাজ’। সেটাও ভালো করে পছন্দ হচ্ছিল না কারোর। সেখান থেকে আসে অন্য নাম।

আরও পড়ুন অভিনেত্রী তৃণা সাহা কি মানসিক রোগী, জল্পনা তুঙ্গে

তবে সেই নামে যাওয়ার আগে এক কবির কথা বলা যাক। চল্লিশের দশকের শহর কলকাতায় রাতের পথে এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে সেই কবি লিখলেন,
“আমরা যাইনি ম’রে আজো-
তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়ঃ
মহীনের ঘোড়াগুলি ঘাস খায়
কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে,
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন-
এখনও ঘাসের লোভে চরে…”
জীবনানন্দের এই শব্দগুলি সত্তরের সেই নাম নিয়ে নাজেহাল হওয়া ব্যান্ডের সদস্যদের ছুঁলো এমনই এক রাতের রাস্তায়। তখন সবে তীরন্দাজ বদলে হয়েছে ‘গৌতম চট্টোপাধ্যায় বিএসসি ও সম্প্রদায়’। কিন্তু সেটাও ছিল না পছন্দের নাম। এই কবিতার হাত ধরে উঠে এলো নাম ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। গান সম্পর্কে তথাকথিত ধারণা পাল্টে দেওয়া ব্যান্ড। ব্যান্ডে গৌতম গাইতেন, লীড গিটার ও স্যাক্সোফোন হাতে তাঁকে দেখা যেতো৷ বিশ্বনাথ ড্রামে ছিলেন, প্রদীপ বাজাতেন বাঁশি৷ এব্রাহাম কখনো পিয়ানো, কখনো ভায়োলিন ছিলেন৷ রঞ্জন দেখতেন মিডিয়া সম্পর্কের বিষয়টা৷ রাজার পর তাপস ও তপেশ গীটার ধরেছিলেন, আর এসব নিয়ে গোটা মহীনের ঘোড়াগুলি। যদিও সেই সময়ে লোকেরা ভালোভাবে নেয়নি ব্যান্ডকে। পরীক্ষামূলক গান করার জন্য অনেকেই কড়া কথা শুনিয়েছিল তাদের। ব্যতিক্রম মানুষ গ্রহণ করতে পারেনা সহজে। শুধু গানেই নয়, তাঁদের কনসার্টের টিকিটগুলোও ছিলো অন্যরকম৷ কখনো সেগুলো ছিলো ডাকটিকিট সদৃশ, কখনো সেখানে থাকতো সকল সদস্যের আঙুলের ছাঁপ৷

 


শোনা যায় ব্যন্ড তৈরি হওয়ার আগে নাকতলার বাড়িতে যখন হত গানবাজনা তখন একবার পা ভেঙ্গেছিল গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের। সেই পায়ের প্লাস্টারেই হাজিরার জন্য হত সই। বাড়ির নাম গৌতম দিয়েছিলেন বেকার হাউস। তারই দেওয়ালে কেউ একজন গানের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে লিখে গিয়েছিলেন আস্তাবল। সেই আস্তাবল থেকেই একদিন টগবগে ঘোড়ারা বেরিয়ে আসবে কে জানতো?
গায়ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বের দাবি রাখেন যন্ত্রীরা। অথচ বাস্তবে সেই সম্মানটা তাঁদের দেওয়া হয় না। এই নিয়ে আক্ষেপ ছিল গৌতমের। তাই সবাই মিলে যেখানে গুরুত্ব পাবেন সেই ভাবনা থেকেই ব্যান্ড তৈরি। বিটলস এর ভক্ত গৌতম আর সমমনস্করা বানিয়েছিলেন ‘আর্জ’ নামের একটি ব্যান্ড। মূলত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বন্ধুদের নিয়ে। কিন্তু রাজনীতির পাঠ , উত্তাল দশক বুঝিয়ে দিয়েছিল গৌতমকে এলিট গ্রাহকদের সামনে ইংরিজি গান গেয়ে বিপ্লব তৈরি হবে না। তার জন্য বাংলায় গান বাঁধতে হবে। বলতে হবে মানুষের কথা। রক্ত-মাংস-ঘামের কথা উঠে আসবে গানের শরীরে।

আশির দশকের গোড়ায় কাজ না পেয়ে যে ব্যান্ড বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আজ
পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে বা ফিরবো বললে ফেরা যায় নাকি, তাকে যত তাড়াই দূরে দূরে শুনলে বুঝতে অসুবিধাই হয়। এমন একটা ব্যান্ড যাদের গানে জড়িয়ে রয়েছে সময়, জীবন , বোহেমিয়ান হাতছানি … তাঁরা নিজেদের সময়ে শ্রোতা কম খুঁজে পেলেও পরবর্তী সময়ে শ্রোতারা খুঁজে নিয়েছেন তাদের। হয়তো দেরী হয়ে গেছে। তবু এখনো ‘রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু কেউ নেই শূন্যতা…’ শুনলে একটু থমকে যেতে হয়।
এক স্টেজের উন্মুক্ত প্রান্তরে দেখা যায় কিছু তরুণ জানাতে চেষ্টা করছেন নিজেদের কথা। এক অন্য দৃশ্যকল্পের জন্ম হয় সত্যিই সেখানে, যাকে শুধুমাত্র চেনে শহরের ইতিহাস।

Related Videos

Leave a Comment