Home Entertainment বাঙালি হয়েও হিন্দিতে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করার কথা ভাবলেন কেন?

বাঙালি হয়েও হিন্দিতে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করার কথা ভাবলেন কেন?

by admin

এই সময়ে গান গাওয়া মানে শুধুমাত্র একজন শিল্পী গান গাইলেন তা নয়, তার আরও অনেক রকমের কাজ থাকে।  যেমন প্রত্যেকটা গানের ক্ষেত্রে একটা ভিডিও শুট হবে।  এক্ষেত্রে সঙ্গীত শিল্পীদের আগে শুধুমাত্র সাংগীতিক দক্ষতা থাকলেই হত কিন্তু এখন এই ডিজিটাল সময় শিল্পীদের দায়িত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিষয় আপনার অভিমত কী? 

এখন সকলেই ডিজিটাল মার্কেটিং এর উপর জোর দিচ্ছে।  এখন তাই শুধুমাত্র অডিও দিয়ে কাজ করা যাচ্ছে না।  পুরনো গান যখনই শুনি, ইউটিউবেও পুরোনো গান, দেখতে পাই একটা স্টিল ছবি এবং সেইসঙ্গে গানটা চলছে।  এর আগে যখন সিডি ক্যাসেটের সময় ছিল তখন কোন ভিস্যুয়াল থাকত না। কিন্তু সেই সময়ের গান শোনার সঙ্গে এখনকার শোনা অনেকটাই আলাদা।   এখন প্রত্যেকটা মানুষ গানের সঙ্গে ভিডিও দেখতে চাইছেন।  আমার মনে হয় এটা মুভি কনসেপ্ট।  যেহেতু সমস্ত মিউজিক স্টেশন,টিভি চ্যানেল সিনেমার গানগুলোকে চালাচ্ছে, তাই কোথাও একটা গিয়ে বাংলা বেসিক গানের ক্ষেত্রেও ভিডিওর একটা চাহিদা তৈরি হয়েছে। সিনেমার গান মানেই সুন্দর সুন্দর দৃশ্য,  ঝলমলে রঙিন একটা বিষয়।  ভিডিও কোয়ালিটি ভীষণ ভালো। তাই তখন পরের গানটা কোনরকম ভিডিও ছাড়া মানুষ আর সেই ভাবে গ্রহণ করছেন না৷  এর ফলে গানের ভিডিও করার একটা ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে।

May be an image of 1 person, standing and musical instrument

 

এই ট্রেন্ডের জন্য এমনও দেখা যাচ্ছে যে গানটা হয়তো সুন্দর নয় কিন্তু তার ভিডিও কোয়ালিটি খুব ভালো৷ সেই গানটা মানুষজন দেখছে।  কিন্তু অন্যদিকে হয়তো ভিডিওটা ততটা সুন্দর নয় কিন্তু কথায় সুরে ভাবে সত্যিই সুন্দর একটা গান,  সেটা মানুষ শুনতে চাইছেন না৷  এই ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হয়  হচ্ছে পরপর কয়েকটা গানের সুন্দর ভিডিও কোয়ালিটির পর যদি কোন একটা গানের ক্ষেত্রে ভিডিও কোয়ালিটি একটু খারাপ হয়, তাহলে সেই গানের অডিও কোয়ালিটি যতই ভালো হোক, গানটা যতই ভালো হোক,  যত সুন্দর সুর হোক না কেন সেই গানটা আর মানুষের কাছে সেভাবে পৌঁছতে পারছে না৷ কারণ মানুষ এর  সবকিছু অভ্যাস৷ এই যে প্রত্যেকটা গানের ক্ষেত্রে দেখার একটা বিষয় থাকছে এটাও কোথাও একটা গিয়ে মানুষের অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।  গান শোনার জন্য, দেখার নয় কিন্তু তবুও এই অভ্যাস আমাদের মধ্যে তৈরি হয়ে যাচ্ছে এটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি।  তাই আমাকেও কাজের ক্ষেত্রে গানের ভিডিও তৈরি করতে হয়।  তবে আমি একটা বেঞ্চমার্ক রেখেছি যে তার কম গুণমানের ভিডিও তৈরি করা হবে না।

ইদানিংকালে বাংলা ভাষার ব্যবহার কমছে।  দেখা যাচ্ছে বাঙালি হয়েও বাংলা ভাষার ব্যবহার সে করতে চাইছে না।বা  বাংলা মাতৃভাষা হলেও সহজভাবে সে বলতে, বুঝতে পারছে না।  তাই সে পছন্দ করেছে ইংরেজি অথবা হিন্দিতে কথা বলতে।  এই সময় দাঁড়িয়ে যখন বাঙালিদের দায়িত্ব বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা, যখন বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন, সেইরকম একটা সময় দাঁড়িয়ে হিন্দিতে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করার কথা ভাবলেন কেন?  এই সিদ্ধান্ত কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল? 

প্রথমেই বলে রাখা দরকার এই কাজ ২০১৩-১৪ নাগাদ করা হয়েছিল।  এবং এই প্রজেক্ট এর নাম ছিল টেগর বিয়ন্ড বেঙ্গল ( Tagore Beyond Bengal) যে  মিউজিক কোম্পানির সঙ্গে কাজ করা হয়েছিল তাদের একটা ভাবনাচিন্তা ছিল যারা বাংলা ভাষাভাষী মানুষ নন, যারা বাংলা ভাষা একেবারেই বোঝেন না,  তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথের গান পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই কাজ৷

 

May be an image of 2 people and text that says "নব রবি কিরণ নিবেদিত গানের ভিতর দিয়ে (হিন্দী ভাষায় রবীন্দ্রসঙ্গীত) বৃষ্টিলেখা নন্দিনী যন্ত্রানুষঙ্গ অভিযেক চক্রবর্তী, সুভাষ পাল পরিচালনা অরিজিৎ মিত্র ১লা ফে্রুয়ারী ২০২১ রাত্রি ৮টা NABA ROBI KIRON YouTube Channel f facebook-এ"

 

রইল হিন্দিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভিডিও 

AR2Sv1jBqJPcN3LimqGSE0iPLUHEf8c9-AFHUTOAeBYGsbA4y9AL_7PYC6k&v=-8z7bsqlw6A&feature=youtu.be

এবার আসি মূল প্রশ্নে, আমি নিজেও বাংলা মিডিয়ামে পড়াশুনা করেছি৷ এখনো পর্যন্ত বিদেশে যখন অনুষ্ঠান করতে যাই,  যদি আমার সামনে বাংলা ভাষাভাষী দর্শক শ্রোতা থাকেন,  সবসময় চেষ্টা করি বাংলায় কথা বলার৷  হয়তো তারা ইংরেজিতে কথা বলছেন কিন্তু তবুও আমি বাংলায় কথা বলি।  এমন অনেক সময় দেখা গেছে, আমি বাংলায় কথা বলছি দেখে তারাও তখন বাংলায় কথা বলতে শুরু করেছেন।যে প্রবণতার কথা বলছ, যে বাঙালি হয়েও বাংলাটা ভালো করে শিখছে না, সন্তানদের শেখাচ্ছেন না, ইংরাজি মিডিয়ামে পড়াশোনা করার দরুন কার্যক্ষেত্রে বাংলা লাগছেনা বলে কিছুটা হলেও বাংলাকে সরিয়ে রাখছেন। তারা হয়ত বেশিরভাগ বুঝতে পারছেন না কতটা ক্ষতি হচ্ছে।  ইংরাজি মিডিয়ামে পড়ব মানেই বাংলা পড়ব না এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই।  যারা হিন্দি ভাষাভাষী মানুষ বা অন্য ভাষার মানুষ তারা প্রত্যেককেই তাদের মাতৃভাষাকে খুব ভালোভাবে শেখেন, ব্যবহার করেন কিন্তু এই প্রবণতা কেবল বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেই দেখা যায়।  এই কারণে আমি চেষ্টা করি মঞ্চে উঠে বাংলায় কথা বলার।  বিদেশে সাধারণত বাঙালি অ্যাসোসিয়েশন এর অনুষ্ঠানে আমাদের ডাকা হয়৷  তাই আমি সবসময় চেষ্টা করি যতটা সম্ভব বাংলার কথা বলতে৷ আমাকে ক্রমাগত বাংলায় কথা বলতে দেখে হয়তো তারা নিজেরাও উপলব্ধি করেন আমার নিজের জীবনে এমন ঘটনা ঘটেছে। বাংলা ভাষার একটা নিজস্ব অসম্ভব মিষ্টতা আছে।

বাংলায় যে আবেদন থাকে রবীন্দ্রনাথের গানে অন্য ভাষায় কি সেটা সম্ভব? 

পেশাদারিত্বের খাতিরে কিছু কাজ করতে হয়।  তাই বাংলা পড়ে আমরা যা  উপলব্ধি করতে পারি অন্য ভাষায় যে সেই একই উপলব্ধি হবে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।  তবে প্রেমকুমার বাবু চেষ্টা করেছেন সেই ভাব বজায় রাখতে এবং আমিও চেষ্টা করছি যাতে গানের সেই ভাব যতটা সম্ভব তা প্রকাশ করা যায় গানের ক্ষেত্রে।

May be an image of 1 person, hair and standing

 

সুর নাকি কথা না কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? কোনটাকে মানুষ বেশি আপন করে ? 

যদি রবীন্দ্রনাথের গানের কথা বলতে হয়,  রবীন্দ্রসঙ্গীত তিনি যেভাবে সৃষ্টি করেছেন তাতে গানের কথা এবং সুর দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।   গানের ক্ষেত্রে কথাটা জরুরী ঠিক সেইভাবে সুর প্রয়োগ হয়েছে। যে জায়গায় বিরহ প্রকাশ পাচ্ছে সেই জায়গায় কোন আনন্দ এর সুরপ্রয়োগ করা হয়নি।  তাই খুব সহজেই ভাষা অন্য হলেও সুর শুনে ভাবটা সহজেই শ্রোতা বুঝতে পারেন৷ এত বছর পরও রবীন্দ্রনাথের মতো আধুনিক আর কেউ নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি পেশাদার সংগীত শিল্পী হয়েও একথা বলতে বাধ্য হচ্ছি রবীন্দ্রনাথের গান বাংলা যেভাবে আবেগ দিয়ে বাংলার যে শব্দ যে ভাব প্রকাশ করে হিন্দিতে বা অন্য কোন ভাষায় সেই ভাব ঠিক ততটাই প্রকাশ করা সম্ভব কিনা সেটা নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন থেকে যায়।  আমি সব রকমের গান গাই।  বাংলা আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ফিউশন হিন্দি সব রকমের গাই৷  কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান যে হিন্দিতে অনুবাদ হতে পারে এ বিশ্বাস আমার নেই। আমি নিজেই হিন্দিতে কাজ করার পরেও একথা বলতে বাধ্য হচ্ছি বাংলায় রবীন্দ্র সংগীতের কথার যে শব্দ দিয়ে যে ভাব প্রকাশ করা হয়েছে সেই একই ভাব  সেটা ইংরেজি বা হিন্দিতে ওইভাবে অনুবাদ করা হয়তো সম্ভব নয়।  কিছু অনুবাদ অবশ্যই সুন্দর।  যেমন গুলজারজি করেছিলেন, সেই অনুবাদ খুবই সুন্দর৷

 

রবীন্দ্রনাথ যেখানে নিজেই বলেছেন তার গান সম্পূর্ণ। তার গানের নতুন করে আর কিছু যোগ বিয়োগ করার নেই৷  তাহলে সেই জায়গায় সত্যিই কি রবীন্দ্রনাথের গানের এক্সপেরিমেন্ট করা উচিত?   এখন নানান রকমের এক্সপেরিমেন্ট হয় সেটা ইন্সট্রুমেন্টাল হতে পারে বা কখনো স্বরলিপি অক্ষরে অক্ষরে মানা হয়না এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখেন ? 

মানুষ সেটাই শোনেন যা শ্রুতি মধুর হয়।  এখন এক্সপেরিমেন্ট সমস্ত ভাষার সমস্ত রকম কাজের ক্ষেত্রে হয়ে এসেছে। সে ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের গান এক্সপেরিমেন্ট করা হবে না তা নয়৷  রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন যে কালোয়াতি রবীন্দ্রসঙ্গীত তিনি পছন্দ করতেন না। রবীন্দ্রসঙ্গীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে হারমনি।  রবীন্দ্রনাথ নিজেও হারমানি পছন্দ করতেন। প্রচুর রবীন্দ্রসংগীত এর সুর রবীন্দ্রনাথ বিদেশি সুর থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন৷  সুতরাং রবীন্দ্রনাথ এক্সপেরিমেন্টের বিরোধী ছিলেন তা নয়।  তিনি নিজেই তার গানে এমন কিছু কর্ডসের ব্যবহার করেছেন যা আজকের দিনেও কম্পোজারদের ক্ষেত্রে ভাবাটা মুশকিল।  তবে রবীন্দ্র সংগীত বিকৃত করে গাওয়া ঠিক নয়। ভাব, ভাষাকে অক্ষুন্ন রেখে যদি এক্সপেরিমেন্ট করা হয় তাহলে সেটাতে অসুবিধে নেই।

 

ফোর্থস্টেজ ক্যানসার! দুঃখ নয়, আশায় উজ্জ্বল হোক আগামী

রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে বিশ্বভারতী একটা প্রতিষ্ঠান।  বেশ কিছুদিন আগে বিশ্বভারতীর উপাসনা গৃহের রবীন্দ্রসঙ্গীত হিন্দিতে গাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।  এই বিতর্ক সৃষ্টির কারণ কী বলে আপনার মনে হয়?

বিশ্বভারতী বহু বছর যাবৎ রবীন্দ্রনাথের গানকে নিজেদের মধ্যে রেখেছিল৷ একটা সময় রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে সবাই ভয় পেতেন৷ কারণ শিল্পী রেকর্ড করলেন।  দেখা গেল সুরের স্বরলিপির সামান্য হেরফের হয়েছে,  বিশ্বভারতী অনুমতি দিল না।  দেবব্রত বিশ্বাসকে বিশ্বভারতী বলতেন নিজের মত গান করেন৷ এদিকে রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস৷ ফলত এবিষয় এত সহজে কিছু বলা মুশকিল৷
বসন্ত উৎসবে রবীন্দ্রনাথের জায়গায় দাঁড়িয়েই বাংলা ভাষাতেই রবীন্দ্রসংগীত কে বিকৃত করে গাওয়া হয়েছে৷ তার ভাষা হিন্দি ছিল না৷ তাই ভাষা সমস্যা বলে মনে হয় না৷ কোথাও একটা গিয়ে সেই ঐতিহ্যকে আঘাত করেছিল৷ বিশ্বভারতীতে বছরের পর বছর বাংলায় গান গাওয়া হয়ে আসছে৷ হঠাৎ হিন্দিতে গাওয়া হয়েছিল তাই হয়ত৷

সাক্ষাতকার গ্রহণ ও লিখন – সায়নী মুখার্জী 

Related Videos

Leave a Comment